বাস্তবিক সুখ: সংসারে যে সমস্ত সুখ বা দুঃখের কথা বলা হয়ে থাকে, তাকে শাস্ত্রে সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে, সেগুলি হল –
১। আধিদৈবিক – সংসারে দৈবীয় প্রকোপের কারণে যে সমস্ত দুঃখের প্রাপ্তি হয় সেগুলিকে আধিদৈবিক বলা হয়। যেমন শীত - গ্রীষ্ম, বন্যা, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন ইত্যাদি।
২। আধিভৌতিক – সংসারে মানুষকে মানুষের দ্বারা, পশুপক্ষীদের দ্বারা, বিভিন্ন প্রকারের গাছ গাছড়া, শেকড়-বাকর ইত্যাদি দ্বারা যে সমস্ত দুঃখের প্রাপ্তি হয় সেগুলিকে আধিভৌতিক বলা হয়।
৩। আধ্যাত্মিক – আধ্যাত্মিক দুঃখ হল দুই প্রকারের হয়, মানসিক আর শারীরিক।
(ক)মানসিক – মনের বৃত্তিগুলির দ্বারা হওয়া দুঃখগুলিকে মানসিক বলা হয়, যেমন রাগ, ঈর্ষা, দ্বেষ, ইত্যাদি।
(খ)শারীরিক – শরীরে বাত, পিত্ত, কফের বিকৃতির দ্বারা যে সমস্ত দুঃখের প্রাপ্তি হয় সেগুলিকে শারীরিক দুঃখ বলা হয়।
আজ সংসারে মানুষ এই তিন প্রকারের দুঃখের হাত থেকে বাঁচার জন্য সুখের খোজ করে। সুখের খোঁজে কখনো সিনেমাহলে যায়, কখনো বা হিল স্টেশন ভ্রমণে যায়। কখনো বা মদ্যপান করে আবার কখনো বা ভোগবিলাসের সামগ্রী সমূহের ভোগ করে থাকে। কিন্তু মানুষের এই সমস্ত প্রচেষ্টা আসলে সুখের প্রাপ্তির জন্য নয় বরং দুঃখসমূহকে কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকার প্রচেষ্টা মাত্র।
এইজন্য মহাপুরুষগণ বলেন “দুঃখকে ভুলে থাকা একরকম, আর সুখের প্রাপ্তি হয়ে যাওয়া হল আর একরকম, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস। মানুষ প্রায়ই দুঃখকে ভুলে থাকার চেষ্টা করে থাকে, কিন্তু সুখের প্রাপ্তির জন্য চেষ্টা করে না।”
যেমন কোনো মানুষ দুঃখকে ভুলে থাকার জন্য মদের নেশার সাহারা নেয়, মদের নেশায় চুর হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু পরদিন সকালবেলা নেশা কেটে গেলে তখন সে দেখে তার সমস্ত রকম চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট ইত্যাদি আগে যেরকম ছিল তখনো ঠিক সেরকমই রয়ে গেছে। বরং কখনো তো এরকমও হয়েছে, নেশার কারণে সে কোন অপরাধ বা ভুল কাজ করে ফেলেছে এবং নতুন কোনও সঙ্কট ডেকে এনে তাকে আরও অধিক চিন্তা, দুঃখ বা কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এটাই মানুষের জীবনের বিড়ম্বনা যে মানুষ ভৌতিক জগতের সম্পত্তির প্রাপ্তির দ্বারা দুঃখকে দূর করার নিরর্থক প্রয়াস করে চলেছে। এই প্রয়াসের দ্বারা সে কিছু সময়ের জন্য অবশ্য দুঃখকে ভুলে থাকতে পেরেছে কিন্তু সুখের প্রাপ্তিতে সে সর্বদা অসফল রয়ে গেছে।
বাস্তবে সুখ এবং দুঃখ হল মানুষের আন্তরিক অবস্থা। সেটা কোনো বাইরের পরিস্থিতি বা সাংসারিক বস্তুসমূহের উপর নির্ভর করে না। সন্ত মহাপুরুষগণ আমাদের বোঝাতে চান যে সুখের সম্বন্ধ তো মানুষের আন্তরিক অবস্থার সাথে জুড়ে রয়েছে।
যখন কৈকেয়ীর বরদান চাওয়ার কারণে প্রভু শ্রীরামকে চোদ্দ বছর বনবাসের জন্য প্রস্থান করতে হয়। জঙ্গলের রাস্তায় প্রভু শ্রীরাম, সীতামাতা, লক্ষণসহ নিষাদরাজের ঘড়ে বিশ্রাম নেবার জন্য আশ্রয় নেন। রাত্রে প্রভু শ্রীরাম একটি পাথরের উপর শুয়ে পড়েছিলেন। আর তাঁর পাশে সীতা দেবী বসে ছিলেন। প্রভু শ্রীরামকে পাথরের শয্যায় শুয়ে থাকতে দেখে নিষাদরাজের চোখে অশ্রুধারা বইতে শুরু করে এবং তিনি লক্ষণের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করেন –
কৈকেয়নন্দিনী মন্দমতি কঠিন কুটিলপনু কীন্হ।
জেহিঁ রঘুনন্দন জানকিহি সুখ অবসর দুখু দিন্হ।।
(রাম চরিত মানস -২/৯১)
রাজা কৈকেয়ের মেয়ে কৈকেয়ী অত্যন্ত মন্দবুদ্ধির যে কিনা প্রভু শ্রীরামকে সুখের প্রাপ্তির সময়ে দুঃখ প্রদান করেছেন। মহারাজ দশরথ তো প্রভু শ্রীরামকেই রাজ্য দিচ্ছিলেন। কিন্তু কৈকেয়ীর কুটিলতার কারণে প্রভু শ্রীরাম এবং জানকীকে রাজ্য সুখ ছেড়ে বনে যেতে হচ্ছে। কিন্তু লক্ষণের দৃষ্টিভঙ্গি এগুলি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নরকম ছিল। তিনি নিষাদরাজকে বলেছেন, আপনি কেবলই কৈকেয়ীকে দোষ দিচ্ছেন সেটা ঠিক নয়। এতে কৈকেয়ীরই বা কি দোষ? এ-সবকিছু তো প্রভুর শ্রীরামের কর্মের ফল।
কাহু ন কোই সুখ দুখ কর দাতা।
নিজ কৃত করম ভোগ সবু ভ্রাতা।।
(রামচরিতমানস – ২/৯২/২)
লক্ষ্মণ বলছেন, কেও কাউকে সুখ-দুঃখ দেয় না। এটা তো ভ্রাতা শ্রীরাম নিজেরই পূর্বকৃত কর্মের ফল ভোগ করছেন। নিষাদরাজ লক্ষ্মণের দিকে আশ্চর্য চকিত নেত্রে তাকিয়ে বললেন, আপনি কী বলতে চাইছেন, প্রভু শ্রীরামের স্বয়ং দ্বারা কৃত কর্মের ফল হিসেবে তাঁকে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। তখন লক্ষণ বললেন আমি কখন বললাম যে প্রভু শ্রীরাম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছেন? আমি তো এরকম বলতে চাইছি, উনি নিজের কর্মের ফল ভোগ করছেন, কিন্তু তাঁকে এই অবস্থায় দেখে কষ্ট কার হচ্ছে আপনার, না কি প্রভু শ্রীরামের? তখন নিষাদরাজ বললেন, দুঃখী তো আমি নিজেই কারণ প্রভুকে এরকমভাবে পাথরের শয্যায় শুয়ে থাকতে দেখে আমারই অত্যন্ত কষ্ট হচ্ছে। তখন লক্ষণ বলেছেন যদি আপনার কষ্ট হচ্ছে তাহলে সেটা তো আপনারই পূর্বকৃত কর্মের ফল যা আপনাকে দুঃখ দিচ্ছে। কর্মের কারণেই আপনার অশ্রুধারা বইছে। কিন্তু প্রভু শ্রীরামকে তো আনন্দিতই দেখাচ্ছে, যেখানে আনন্দ বা হর্ষ আছে সেখানে আবার শোক বা দুঃখ কিসের?
স্বয়ং প্রভু শ্রীরাম যখন অযোধ্যায় মাতা কৌশল্যার কাছে যান তখন মাতা কৌশল্যা প্রেম ভাবের সহিত শ্রীরামকে ফল এবং মিষ্টান্ন খেতে দিলেন। প্রভু শ্রীরাম মাতা কৌশল্যাকে হর্ষিত দেখে দেখে বলছেন, মা তুমি তো আমার যুবরাজ হওয়ার খবরে এত খুশি হয়েছ। কিন্তু যখন তুমি জানতে পারবে যে আমাকে শুধু যুবরাজই নয় বরং রাজা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে তখন তোমার খুশি বহুগুণ বেড়ে যাবে তাই না মা? মাতা কৌশল্যা আশ্চর্যচকিত নেত্রে প্রভু শ্রীরামের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে কি রাজা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে? প্রভু শ্রীরাম বললেন, হাঁ মা, আমাকে রাজা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। “পিতাঁ দীন্হ মোহি কানন রাজু।” (অযো – ৫২/৩) পিতা আমায় বনের রাজ্য দিয়েছেন। অযোধ্যার সিংহাসনে বসলে আমি কেবল শোভার বস্তু বনে যেতাম। তাই রাজ্যে থাকার পরিবর্তে বরং আমার এই সময় বনের রাজ্যে থাকাই বেশি প্রয়োজন।
উপরোক্ত বাক্যের দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে সুখ এবং দুঃখের অনুভব মানুষের আন্তরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। একথার বিশেষ মহত্ত্ব থাকে না যে অন্যের ব্যবহার আমাদের প্রতি কিরূপ, বরং মহত্ত্ব একথার যে আমরা অন্যের দ্বারা কৃত ব্যবহার কিরূপ দৃষ্টিতে নিই।
যেমন এক কুয়োতে দুটো কপিকল(চাকা) লাগানো ছিল। সেই কপিকলের দুটো দড়িতে দুটো বালতি বাঁধা ছিল। ঐ দুই বালতির মধ্যে একটি বালতি সবসময় সুখী থাকতো আর দ্বিতীয় বালতিটির সর্বদা দুঃখী অবস্থাতে সময় কাটত। একদিন সুখী বালতি দুঃখী বালতিকে জিজ্ঞাসা করে, সবসময় তুই দুঃখী থাকিস কেন রে? উত্তরে দুঃখী বালতি বলে দুঃখী থাকবো না তো কি, আমি যতবার জলে ভরতি হয়ে উঠি ততবারই লোকেরা আমাকে খালি করে দেয়। আর তারপর আমাকে পুনরায় কুয়োর মধ্যে ফেলে দেয়। একথা বলে দ্বিতীয় বালতি প্রথম বালতিটিকে প্রশ্ন করে, যদিও আমরা দুজনে একই রকমের কাজ করে থাকি, তা সত্ত্বেও তুমি কী করে সবসময় প্রসন্ন বা খুশী থাকো। প্রথম বালতি বলে, আমি এজন্যই খুশী থাকি, লোকেরা আমাকে তো খালি করে কুয়োর মধ্যে ফেলে কিন্তু আমি আবার জলে ভরা হয়ে বেরিয়ে আসি। ভাবার্থ হল, নিজের প্রতি অপরের দ্বারা কৃত ব্যবহার আমাদের দৃষ্টিকোণের অনুসারেই সুখ এবং দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের ভৌতিক যুগে বেশিরভাগ মানুষ কেবল সাংসারিক ধনসম্পত্তি ইত্যাদিকেই সুখের কারণ বলে মনে করে। কিন্তু এটা জরুরী নয় যে কেবল সংসারের ধনসম্পত্তির দ্বারাই আমাদের সুখ প্রাপ্তি হবে।
একবার এক সাংবাদিকের সঙ্গে রমেশ কুমার নামক একজন ধনী শেঠের বার্তালাপ হয়। তিনি শেঠকে প্রশ্ন করেন, আপনার কারখানাগুলি কোথায় কোথায় রয়েছে? কোন কোন শহরে আপনার কোঠীবাড়ি রয়েছে। আলোচনার মধ্যে বোঝা যায়, শেঠ প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক। তখন সাংবাদিক বলেন, আপনি তাহলে অত্যন্ত সুখী ব্যক্তি হবেন, কারণ আপনার কাছে তো অপার ধন দৌলত রয়েছে। একথা শুনে রমেশ কুমার হেঁসে ফেলেন, বলা শুরু করেন, এটা তো ঠিক আমার কাছে প্রচুর ব্যবসা কারবার, ঘরবাড়ী, ধনদৌলত ও সম্পদ রয়েছে। কিন্তু আমি সুখী একথা তুমি কী করে বলছ? তিনি বলেন আমি আমার দৈনিক জীবনে যেটা অনুভব করি তাহলো, আমার থেকে আমার ড্রাইভার বেশি সুখী। তখন সাংবাদিক আশ্চর্য চকিত নেত্রে শেঠের দিকে তাকিয়ে বললেন, ধনসম্পত্তি তো আপনার হাতে, কিন্তু সুখী আপনার ড্রাইভার, এটা আপনি কী করে বলছেন? রমেশ কুমার মুচকি হেঁসে বললেন মহাশয়। আমি যখন কোনও কাজে ড্রাইভারকে গাড়ীতে ছেড়ে অফিসে যাই, সেখান থেকে ফিরে ড্রাইভারকে নিশ্চিন্তে শুয়ে ঘুমোতে দেখি। যেখানে আমি রাতে নরম গদির বিছানায় শুয়ে, এয়ার-কন্ডিশনার মেশিন চালু করার পরেও ঘুমের ঔষধ নিতে হয় তাতেও অনেক সময় চোখে ঘুম আসে না, তখন ওষুধের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হয়। যদি কখনো কোনও হোটেলে খেতে ঢুকি তো অনেকরকম কথা ওয়েটারকে বুঝিয়ে বলতে হয়, লঙ্কা বেশি দেবে না, ডালে আর সবজিতে ঘি দেবে না, কফিতে চিনি দেবে না ইত্যাদি আর আমার ড্রাইভার যে কিনা আমার সামনে বসে সবকিছুই দিব্যি সুন্দর খেতে থাকে। অথচ কোনদিন ওকে অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখিনি। কিন্তু আমি যদি ভুল করে একদিন কফিতে চিনিসহ নিয়ে ফেলি তাহলে সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ি আর ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে অনেক ওষুধ খেতে হয়। তাহলে এবার আপনিই বলুন সুখী কে, আমি না আমার ড্রাইভার?
এটাই মানুষের সবথেকে বড় ভুল ধারনা যে কারো কাছে অপার ধনসম্পত্তি আছে, ভালো কাজ কারবার চলছে, কোনও রকম জিনিষের অভাব নেই, তাই সে সুখী হবে। আজ সমস্ত মানুষ এইরকমই মৃগতৃষ্ণার কবলে পড়ে রয়েছে, ভাবে ধন সম্পত্তি আসলেই সুখ আসবে এরকম ভেবে কেবলই পথভ্রষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ কোনো সাংসারিক বস্তুর প্রাপ্তির মধ্যে চিরস্থায়ী সুখ নেই। মানুষ যাকে সুখ ভাবে আসলে সে তো ক্ষণিকের সুখ, তা ক্ষণস্থায়ী। প্রতিটি সাংসারিক বস্তুর থেকে প্রাপ্ত সাময়িক সুখের পেছনে এক চিন্তা-রূপী দুঃখ লুকিয়ে থাকে। কখন ভেঙ্গে, ফেটে, ছিঁড়ে, নষ্ট হয়ে, চুরি বা হারিয়ে যায়। যার কাছে যত বেশী সাংসারিক বস্তু রয়েছে তার মানসিক চিন্তা ততবেশি। মানসিক চিন্তা যার যতবেশী, মানসিক আর শারীরিক অসুস্থতাও তার তত বেশী। মানুষ সেটা অনেক দেরীতে বোঝে। আবার অনেক সময় মানুষের সামনে এমন পরিস্থিতি আসে যখন সংসারের থেকে প্রাপ্ত কষ্টও আমাদের সুখ প্রদান করে।
যেমন পায়ে যদি কাঁটা ফুটে তখন আমাদের পথ চলতে কত কষ্ট হয়, আমরা দুঃখী হই। ডাক্তারের কাছে গেলে অপারেশন করে সেটি বের করে দেন, ইনজেকশনও দেন তাতেও আমাদের ব্যথা হয় কিন্তু ডাক্তারের দেওয়া ব্যথা সত্ত্বেও আমরা ডাক্তারকে পয়সাও দিই সেইসঙ্গে ধন্যবাদও দিই। কারণ আমরা জানি যে ডাক্তারের দ্বারা দেওয়া ব্যথা আমাদেরকে রোগমুক্ত করবে।
উপরোক্ত উদাহরণগুলির দ্বারা এটা স্পষ্টতই বোঝা যায় যে সুখের অথবা দুঃখের অনুভূতি তার পরিণামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। যে সমস্ত উপলব্ধির পরিণাম আমাদের সুখ দেয়, সেগুলি হল সঠিক বা উচিত, আর যে সমস্ত উপলব্ধির পরিণাম আমাদের দুঃখ দেয়, সেগুলি অনুচিত, আমাদের জন্য দুঃখের কারণ হয়ে থাকে। ডাক্তারের দ্বারা চিকিৎসার জন্য দেওয়া কষ্ট আমাদের জন্য লাভপ্রদ, কারণ সেটা আমাদের রোগের নিবারণ করে। এই রকমই সংসারের থেকে প্রাপ্ত দুঃখও হাজার সুখের থেকেও মহান হয়, যদি তা আমাদের পরমাত্মার সঙ্গে মিলন করিয়ে দিতে সমর্থ হয়।
বলা হয়, মহাভারতের যুদ্ধের সমাপ্তির পর যখন যুধিষ্ঠির রাজা হলেন, তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকা চলে যাওয়ার সংবাদ কুন্তীর কাছে দিতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার কী চাই বলুন। তখন কুন্তী উত্তরে বললেন, সংসারে যত রকমের দুঃখ আছে সেগুলি সব আমাকে দিয়ে দাও। কুন্তীর মুখে সেকথা শুনে শ্রীকৃষ্ণ বললেন আপনি এসব কী চাইছেন? সারা জীবন তো আপনি দুঃখই দেখলেন আর তা সত্ত্বেও আরও দুঃখ চাইছেন? তখন কুন্তী বললেন আজ পর্যন্ত আমাদের উপর দুঃখ ছিল, সঙ্কট ছিল বলেই আপনি আমাদের সাথে ছিলেন এবং সহায় ছিলেন। আজ যখন রাজ্যসুখ পেলাম তো আপনি আমাদের ছেড়ে দ্বারকা চলে যেতে চাইছেন। এরকম সুখের কী লাভ যা আমাদেরকে আপনার থেকে দুরে সরিয়ে দেয়। সন্ত সহজোবাই বলেছেন –
সুখকে মাথে সিল পড়ে জো নাম হৃদয় সে জায়ে।
বলিহারী বা দুঃখ কে রহে নাম লৌ লায়।।
সেই সুখে কী লাভ যা আমাদের প্রভুর থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় ? সহজোবাই বলেছেন আমি তো সেই দুঃখকেই বলিহারি দিই, যে দুঃখ আমায় প্রভুর নামের সাথে জুড়ে দেয়।
বাস্তবিক সুখ জানতে হলে একটি উদাহরণ দেখুন। অত্রি নামের একজন আচার্য ছিলেন। তার একটি কন্যা সন্তান ছিল যার নাম আপালা। আপালার শরীরে কিছু দাগ ছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দাগগুলিও বেড়ে যাচ্ছিল। সেটা অত্রির কাছে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অত্রি ভাবে যদি শরীরে কুষ্ঠ রোগ ছড়িয়ে পড়ে তাহলে কেউ তাকে বিয়ে করবে না। আর সারা জীবন তার কাছে বোঝা হয়ে থাকবে। এরকম ভেবে অত্রি নিজেরই এক শিষ্যের সাথে আপালার তড়িঘড়ি বিয়ে দিয়ে দেন। আপালা তার পিতার দ্বারা কৃত এই কর্মে অত্যন্ত দুঃখী হয়। আপালার বিয়ের পর কিছুদিন তো সুখেই কাটে। কিন্তু যেমন যেমন সময় পার হতে থাকে আপালার শরীর কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়। বাড়তে থাকা কুষ্ঠের কারণে তার স্বামীর সঙ্গেও দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে কুষ্ঠরোগ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হতে থাকে। একদিন তার স্বামী তাকে ঘড় থেকে বের করে দেয়। এরকম অবস্থায় নিজের কুষ্ঠ রোগগ্রস্ত শরীর নিয়ে সে কোথায় যাবে, কারণ তার বাবা তো এই কুষ্ঠের ভয়েই তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে ঘড় থেকে বিদায় করে দিয়েছেন। চিন্তিত আপালা কাঁদতে কাঁদতে দুঃখিত হৃদয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা দেয়।
যখন আপালা জঙ্গলের দিকে যাচ্ছিল তখন পথে এক সন্যাসী মহাত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। সেই মহাত্মা আপালাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। আপালা মহাত্মাকে প্রণাম করে, মহাত্মা তাকে হাত উঠিয়ে আশীর্বাদ করে। আপালা মহাত্মার চরণে মাথা রেখে খুব কাঁদে। মহাত্মা দেখেন, আপালার সারা শরীর থেকে কুষ্ঠ রোগের কারণে কিরকম অত্যন্ত ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে।
মহাত্মা আপালাকে নিজের কুটীরে নিয়ে যান আর কুটীরে বসিয়ে আপালার কাছে তার সমস্ত ব্যথার বর্ণনা শোনেন। তারপর বলেন – “আপালা এই সংসার আসলে দুঃখ আর স্বার্থে ভরা। এই মায়াময় জগতে কোনও মানুষই সুখী নয়। প্রত্যেক মানুষই সুখ প্রাপ্তির আশায় সাংসারিক কর্মে লিপ্ত।”
হে আপালা! তোমার শরীরের এই রোগ তো তোমার পূর্বজন্মে কৃত দুষ্কর্মের ফল যে কারণে এভাবে তোমাকে পিতা আর পতিও সংসার থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা অন্য যোনিতেও নিজেদের দ্বারা কৃত কর্মের ফল ভোগ করার জন্য বাধ্য হই। এভাবে না জানি আমাদের কত রকমের দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হয়। আপালা তুমি তো মানব শরীর পেয়েছ, তাই তোমার দুঃখ আমার কাছে বলতে পারছ। কিন্তু অনেক জন্তু জানোয়ারদেরও এরকম অনেক রকমের ভয়ঙ্কর অসুখ হয়, তাদের শরীরেও ঘা হয়ে যায়, যার মধ্যে পোকাও লেগে যায়, অত্যন্ত কষ্ট পায়, কিন্তু তারা নিজের দুঃখের নিবারণের জন্য কিছুই করতে পারে না। কিন্তু মনুষ্য শরীরকে তো সমস্ত যোনির মধ্যে উত্তম বলা হয়, একে ভোগের সাথে সাথে কর্ম যোনীও বলা হয়, কারণ একমাত্র এই শরীরেই আমরা সমস্ত কর্মের বন্ধনকে কাটতে পারি। বাকী অন্য সমস্ত যোনিতে ভোগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না বলে সেগুলিকে ভোগ যোনি বলা হয়।
সংসারে মনুষ্য এক কর্ম থেকে বাঁচতে অন্য কর্ম করে থাকে। কিন্তু অন্য কর্ম আরও কিছু নতুন কর্মের জন্ম দেয় যা কেবল জীবের জন্য বন্ধন এবং দুঃখের কারণ বলে সিদ্ধ হয়। যেমন একটি বীজ থেকে বৃক্ষের উৎপত্তি হয়, বৃক্ষের দ্বারা অনেক নতুন বীজের উৎপত্তি হয়। আর সেই সমস্ত বীজগুলি থেকে অসংখ্য নতুন নতুন বৃক্ষ উৎপন্ন হয়।
কিন্তু সেই বীজটিকে যদি আগুনে ফেলে দেওয়া হয় তাহলে সেটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তখন সেটি থেকে আর নতুন বৃক্ষ জন্মানোর কোনও সম্ভাবনা থাকে না । ঠিক সেরকমই কর্মের বন্ধন থেকে, কর্মের দুঃখ থেকে ছাড়া পাবার একমাত্র উপায় হল “অজোপা নাম”। অজোপা নামের দ্বারাই জীব নিজ দ্বারা কৃত কর্মের বন্ধন থেকে ছাড়া পেতে পারে।
মহাত্মা আপালাকে মানব তনের মহত্ত্ব বোঝাতে গিয়ে বলছেন, আপালা এই মানব তন জীব পেয়ে থাকে কেবলমাত্র প্রভুর প্রাপ্তির জন্য। মনুষ্য জীবনের মহত্ত্ব তো তখনই যখন জীব প্রভু প্রাপ্তির দিকে অগ্রসর হয় কারণ কেবল সেই পরমাত্মাই হলেন পরম সুখদায়ক আর জীবকে এই মায়াময়ী জগতের দুঃখ আর বন্ধন থেকে মুক্ত করতে পূর্ণরূপে সমর্থ। এজন্য তুমি সবার আগে আত্ম-জ্ঞানকে জানো, তারপর সেই প্রভুর প্রাপ্তি করো যিনি তোমাকে পরম সুখ আর শান্তি প্রদান করবেন।
আপালা মহাত্মার কাছে প্রার্থনা করে বলেন, এই সংসারে আমার কেউ নেই। আপনি আমায় উপকার করে এই কুটীরে আশ্রয় দিয়েছেন, আমার দুঃখের কথা শুনেছেন, আর যে জ্ঞানের চর্চা আপনি করছেন, আমি কিভাবে সেই মহান আত্ম-জ্ঞান পাবো যার দ্বারা নিজের কৃতকর্ম সংস্কারকে কাটাতে পারবো। আপনি এই দীনের উপর কৃপা করে আমায় সেই ‘আত্মজ্ঞান’ প্রদান করুন। তখন মহাত্মা আপালাকে আত্ম-জ্ঞান প্রদান করেন, আপালাকে তার হৃদয়েই প্রভুর সাথে মিলনের রাস্তা দেখিয়ে দেন। আপালা আত্ম-জ্ঞান প্রাপ্ত করে অত্যন্ত খুশি হন। মহাত্মাকে প্রণাম করে তাঁকে ধন্যবাদ দেন তারপর আপালা, মহাত্মার আজ্ঞা পেয়ে সাধনা করার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। আর জঙ্গলে একটি উপযুক্ত স্থান দেখে ধ্যান-সাধনায় বসে পড়েন । আপালা দিন-রাত প্রভুর ধ্যানেই লীন হয়ে থাকা শুরু করেন।
এভাবে সাধনা করতে করতে আপালার অনেক বছর কেটে যায়। তার ভক্তিতে প্রসন্ন হয়ে পরমাত্মা স্বয়ং দর্শন দেন। আপালা প্রভুর দর্শন পেয়ে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়, তখন তার খুশির সীমা থাকে না। প্রভু আপালার প্রেম ভক্তি দেখে বলেন যে – হে আপালা! তোমাকে তোমার এই কুষ্ঠ অনেক দুঃখ দিয়েছে। এই কুষ্ঠ রোগের ভয়ের কারণে তোমার বাবা তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়েছেন আর পতিও তোমাকে ঘড় থেকে বের করে দিয়েছেন। আপালা এই কুষ্ঠের কারণে তোমাকে অনেক দুঃখ সহ্য করতে হয়েছে। যদি তুমি বল তো আমি তোমার এই কুষ্ঠ ব্যাধি ঠিক করে দেব।
আপালা বলেন, হে প্রভু! এই কুষ্ঠের কারণেই তো আমি সংসারের বাস্তবিকতাকে জানতে পেরেছি। আর এই কুষ্ঠ তো আমার নিজেরই দ্বারা কৃত কর্মের প্রতিফল তাই এতে কার কীসের দোষ?
এই রোগই তো আমাকে সংসার থেকে সরিয়ে আলাদা করে আপনার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। তাই আপনি যদি আমায় কিছু দিতেই চান তো আপনার চরণের প্রীতি প্রদান করুন। আমায় সেই শক্তি প্রদান করুন জাতে আমি সমস্ত জনগণের কাছে আপনার ভক্তির সন্দেশ পৌঁছে দিতে পারি। আর মনুষ্যকে প্রভুভক্তির প্রতি প্রেরণা জোগাতে পারি। তখন প্রভু তাঁকে সেই বরদান দেন।
বরদান পেয়ে আপালা ঈশ্বরের প্রচারে লেগে যায়। ধীরে ধীরে আপালার কুষ্ঠ ব্যাধি আরোগ্যের দিকে এগোতে শুরু করে। এবং কিছু দিনের মধ্যেই সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। আপালার খ্যাতি অনেক দূর দূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এই খবর যখন তার স্বামীর কাছে পৌঁছায়, সেও আপালার কাছে পৌঁছে যায়। আপালার চেহারায় এক রকমের অলৌকিকতা দেখে সে খুব আশ্চর্য হয়। আপালাকে অত্যন্ত প্রসন্ন দেখাচ্ছিল। আপালাও তাঁকে দেখামাত্র চিনে ফেলেন। তখন সে আপালার কাছে নিজের দ্বারা কৃত ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চায় এবং পুনরায় ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য কাকুতি মিনতি শুরু করে, কিন্তু আপালা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
আপালা বলেন, আপনি পতি হয়েও আমাকে পরিত্যাগ করে দিয়েছেন কিন্তু পরমাত্মা আমার কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত শরীরেও নিজের ভক্তি প্রদান করে তাঁর চরণের সাথে জুড়ে দিয়েছেন। তাই এখন আমার এই জীবন প্রভুর চরণেই সমর্পিত হয়ে গেছে আর বাকী জীবনকাল তাঁর সেবাতেই লেগে থাকবো। বাকী জীবনকাল আপালা ভক্তি ও প্রচারেই ব্যতীত করেন। এইভাবে আপালা প্রভু ভক্তির দ্বারা শারীরিক দুঃখ থেকে মুক্তি পান।
আমাদের সামনে এধরনের অনেক উদাহরণ রয়েছে, যখন সঙ্কটের সময়ে ভক্ত প্রভুকে শ্মরণ করেছে এবং প্রভু তার রক্ষা করেন, ভক্তের সঙ্কট হরণ করেন। তাই আপালার দুঃখ তার জন্য বরদান হয়ে যায়। এরকম দুঃখই তার কাছে পরমাত্মার প্রাপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাধারণত মানুষের দুঃখের সময়েই প্রভুর কথা মনে পড়ে। সুখের সময় সাংসারিক সুখকেই সব কিছু ধরে নিয়ে আনন্দিত হয়ে মত্ত থাকে। কবীর দাস বলছেন –
দুঃখ মে সুমিরন সব করে সুখ মেঁ করে না কোয়।
জো সুখ মেঁ সুমিরন করে তো দুঃখ কাহে কো হোয়।।
দুঃখের সময়ে তো সবাই প্রভুর শ্মরণ করে। যখন জীবের উপর দুঃখ কষ্ট আসে তখন সে প্রভুকে ডাকে, কিন্তু যখন সুখ আসে তখন প্রভুকে ভুলে যায়। কবীর আরও বলছেন, সুখের সময়েও যদি পরমাত্মাকে ডাকা হয় তাহলে দুঃখ হবেই বা কেন? কিন্তু আমাদের ভেবে দেখতে হবে, কবীর কোন সুখ বা দুঃখের কথা বলছেন?
এখানে কবীর নিঃসন্দেহে সাংসারিক সুখ বা দুঃখের কথা বলেননি। সাংসারিক দুঃখ তো মুনিঋষি, গুরু, সন্ত ও মহাপুরুষ এবং অবতারগণকেও ভুগতে হয়েছে। প্রভু শ্রীরামকেও চোদ্দ বছর বনবাস ভুগতে হয়েছে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তো কারাগৃহের মধ্যে হয়েছে, কুরুক্ষেত্রে সারথি হয়ে রথ চালাতে হয়েছে, শ্রীগুরু অর্জুনদেবকেও গরম তাওয়ার উপর বসতে হয়েছে, মাথার উপর গরম বালি ঢেলে দেওয়া হয়েছে। শ্রীগুরু গোবিন্দ সিংকে যুদ্ধে নিজের চার পুত্রকে বলিদান দিতে হয়েছে এবং নিজে মাছীবারের জঙ্গলে খালি পায়ে হেঁটে এক বৃক্ষের নীচে আরাম করতে হয়েছে। শ্রীগুরু হরকিশনদেবের বসন্ত রোগের কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। সম্সতবরেজের ছাল-চামড়া ছিঁড়ে নেওয়া হয়। যিশুখ্রিস্টকে ক্রুশ বিদ্ধ করা হয়, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হন, চৈতন্য মহাপ্রভুর সেপটিক হয়, এভাবে সন্ত মহাপুরুষগণকে সংসারে অনেক রকমের কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
সন্ত-মহাপুরুষ তো সবাইকে নাম সুমিরন করাতে চান। সবাইকে সুমিরনের সঙ্গে জুড়ে দিতে চান আর কবীর বলেছেন সুখে যে সুমিরন করে তার আবার দুঃখ কীসের। এখন আমরা যদি ভৌতিক দৃষ্টিতে দুঃখকে দেখি তাহলে তো মহাপুরুষগণ পর্যন্ত তা থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেননি। তাহলে আমরা কী করে বলতে পারি সুখেও যে সুমিরন করে তার দুঃখ আসে না। অতএব আমাদের ভেবে দেখতে হবে, মহাপুরুষ কোন দুঃখের কথা বলতে চেয়েছেন। এই কথাটি কবীর গুরবাণীতে বলেছেন যে – “এক দুঃখ রাম রাএ কাটো মেরা অগিনি দেহ ঔর গরভ বসেরা।” তিনি বলেছেন, আমাদের সবচেয়ে বড় দুঃখ হল অসংখ্য জন্ম আর মৃত্যুর দুঃখ। সেই দুঃখ যা মায়ের গর্ভে জঠরাগ্নিতে, যেখানে এক জীব উল্টোভাবে ঝুলে থাকাকালীন প্রভুর কাছে প্রার্থনা করে, পৃথিবীর বুকে আমায় একবার জন্ম দাও, মানবের তন দাও প্রভু, আমি তোমার ভক্তি করব। কবীর মানবকে সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দিতে গিয়ে বলছেন –
কবীরা ওহ দিন য়াদ কর পগ উপর তল শীশ।
মৃত মণ্ডল মেঁ আয়ে কর বিসর গয়ো জগদীশ।।
সেই দিনের কথা শ্মরণ করো যখন মায়ের গর্ভে উল্টোভাবে ঝুলে থেকে প্রভুকে শ্মরণ করছিলে। এখন সুখ প্রাপ্তির জন্য মানব তন পেয়ে ভুলে গেলে সেই প্রভুকেই, যিনি কৃপা করে তোমায় মানব তন দিলেন । এজন্য কবীর বলছেন যে
–“দুঃখ মে সুমিরন সব করেঁ” মায়ের গর্ভে সবাই শ্মরণ করছিলে, কিন্তু “সুখ মে করে না কোয়”
অর্থাৎ মানব শরীরে জন্ম নিয়ে সেই পরমাত্মাকেই ভুলে গেলে? যিনি তোমায় সোনার মত শরীর দিলেন। তারপর বলছেন “জো সুখ মে সুমিরন করে তো দুঃখ কাহে কো হোয়” যে ব্যক্তি এই মনুষ্য তন প্রাপ্তির পরেও(সুখে) সুমিরন(শ্মরণ) করে তবে তাঁকে বারবার জন্ম মরণের, গর্ভ আর চিতার অগ্নির, দুঃখ সইতে হবে কেন? যে জীব মনুষ্য তন প্রাপ্তির পর প্রভুর ভক্তি করে, প্রভুর দর্শন করে, তার জন্য বলা হয়েছে, “তমেব বিদিত্বাতি মৃত্যুমেতি” সে মৃত্যুকে পার হয়ে যায়। আর যদি জন্ম-মৃত্যুর দুঃখই কেটে যায়, তখন না জন্ম থাকল, আর না মৃত্যু, তাহলে আর দুঃখ কীসের? তখন ভৌতিক জগতের কষ্টসকল নিজে থেকেই শেষ হয়ে যাবে। যতদূর ভৌতিক জগতের কথা সম্পর্কে তিনি বলেছেন –
দেহধারী কো দণ্ড হে বচ সকে না কোয়।
জ্ঞানী ভোগে জ্ঞান সে অজ্ঞানী ভোগে রোয়।।
ভৌতিক জগতে দুঃখ তো সবাইকে ভুগতে হয়। তাতে কোনও সাংসারিক ব্যক্তিই হোক কিমবা কোনো সন্ত মহাপুরুষ। একটি বাচ্চা যেমন ডাক্তারকে দেখলে ভয় পায়। ডাক্তারের নাম শুনলে কাঁদতে শুরু করে। টীকা বা ইনজেকশন লাগানোর নাম শুনলে কান্না শুরু করে কারণ সে হল অজ্ঞানী। সে জানে না যে টীকা লাগালে তারই লাভ হবে। কিন্তু বড় হয়ে বুঝতে শিখলে প্রয়োজন হলে সে নিজেই ডাক্তারের যায়। তার কাছে নিজের কষ্টের কথা খুলে বলে। ডাক্তার ইনজেকশন দেয়। সেই ব্যক্তি ডাক্তারের ফী দিয়ে তাকে ধন্যবাদ দেয় এবং খুশি হয়ে ঘরে ফেরে। কারণ সে জানে যে ডাক্তার কীভাবে তার ভালোর জন্যই ইনজেকশন দিয়ে রোগমুক্ত করেছেন।
ঠিক সেরকমই সংসারে বাস্তবিক সুখ-দুঃখ সবার উপর আসে, তাতে কেও সন্তই হোক বা সাংসারিক ব্যক্তি। কিন্তু সাংসারিক ব্যক্তি দুঃখ পেলে কাঁদে, যেখানে সন্ত দুঃখের চিন্তা করে না। সে হাঁসতে হাঁসতেই দুঃখকে ভোগ করে নেয়। সে সেই বালকের মত অজ্ঞানী নয়, বরং জ্ঞানের সঙ্গে জুড়ে থাকার কারণে জানে যে কর্মের ফল তো ভুগতেই হবে। কেবল জ্ঞানের অগ্নিই এক এমন অগ্নি যা কর্মের বীজকে নাশ করে দিতে সক্ষম। এই কথাকেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতাতে বলছেন যে –
“জ্ঞানাগ্নিঃ সর্বকর্মাণি ভস্মসাৎকুরূতে ” (গীতা – ৪/৩৭)
আমরা যদি জীবনে শাশ্বত সুখ এবং শান্তির প্রাপ্তি করতে চাই, তাহলে আমাদের সবার আগে প্রয়োজন হল পূর্ণ সদগুরুর শরণে পৌঁছে আত্ম-জ্ঞানের প্রাপ্তি করা। আর তখনই আমরা জীবনকে সুখময় বানাতে পারবো। আর যদি আমরা মন বুদ্ধির দ্বারাই কর্মের চিকিৎসা করতে থাকি, তাহলে কর্মের বন্ধনগুলিকে বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনরকমের সফলতা প্রাপ্তি সম্ভব নয়। অনন্ত জন্ম-মরণের ভয়ানক আবাগমন চক্রের বন্ধনকে আঁকড়ে ধরে থাকতে বাধ্য হবো। এজন্য গুরবাণীতে বলা হয়েছে –
জউ সুখ কউ চাহৈ সদা সরনি রাম কী লেহ।
কহু নানক সুনি রে মনা দুরলভ মানুখ দেহ।।
(গুরবাণী – ৯/১৪২৭)
More Related Topics You may Like to Read

No comments:
Post a Comment