Thursday, 25 July 2019

ধর্ম কি?


ধর্ম কি?



ধর্ম কি আজ আমরা কারও মুখে যখনধর্ম-সঙ্কটে’ কথাটি শুনি তখন আশ্চর্য লাগে, অবাকও হতে হয়। শাস্ত্রে সর্বদাই ধর্মের সম্পর্কে বলা হয় “ধর্মো ধারয়তি প্রজাঃ”। ধর্মের দ্বারাই প্রজাদের রক্ষা হয় যে ধর্ম নিজেই সঙ্কটে বা বিপদে পরেছে সে কী করে প্রজাকে রক্ষা করতে পারে। আজকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ধর্ম কেবল একটি শব্দ-মাত্র হিসেবেই রয়ে গেছে। মানুষ ধর্মের বাস্তবিক রহস্যকেই ভুলে গেছে, এমনকি ধর্মকে শুধু মানার মধ্যেই সীমিত করে ফেলেছে, কিন্তু কী কারণে মানা হয়, সেটাও জানে না।  সাম্প্রদায়িক রীতি রেওয়াজ, তৎকালীন প্রচলন, কথা কিংবদন্তিকেই ধর্মের পরিবর্তিত রূপ ধরে নিয়ে প্রতিনিয়তই মানুষ সেগুলিকেই ধর্ম মেনে বসে আছে। শাস্ত্রে প্রমাণের দ্বারা এটা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে ধর্মের কখনোই পরিবর্তন হয় না। পরিবর্তন হয় কেবল ব্যবহারের মধ্যে। কিন্তু মানুষ ব্যবহারকেই ধর্ম ভাবার কারণে ভুল করে দিশাহারা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বস্তুতঃ সমস্ত জাগতিক এবং ব্যক্তিগত  সুখ-শান্তি, প্রগতি এবং সমৃদ্ধির একমাত্র আধার হল ধর্ম। যদি মানুষের মধ্যে এই তত্ত্বটিই সমাবিষ্ট থাকে তাহলে এর জন্য তাকে অবশ্যই ধর্মের অবলম্বন করতে হবে এবং এই ধর্মপথের অবলম্বনে লাভ ছাড়া ক্ষতি কখনোই হতে পারে না। মানব জাতির প্রগতি ধর্মের দ্বারাই সম্ভব হতে পারে। যখন-যখন মানুষ ধর্ম থেকে দূরে সরেছে, ধর্মকে সঠিকভাবে না বোঝার কারণে অধর্মের পথে চলা শুরু করেছে তখন-তখনই মানব জাতির বিনাশ হয়েছে। মনুষ্য জীবনের স্থিরতা ধর্মের সিদ্ধান্তের উপরেই টিকে আছে। সমাজের অস্তিত্বও তখনই বিপদের সম্মুখীন হয় যখন তার পেছনে অধর্ম আর অনৈতিকতার প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সব সময়, মানবের একতা এবং অখণ্ডতার জন্য মুখ্যরূপে ধর্মের প্রয়োজন। মহাভারতের শান্তি পর্বে বলা হয়েছে –

আহার নিদ্রা ভয় মৈথুনং চ সামান্যমেতৎপশুভির্নরাণাম্।
                            ধর্মো হি তেষামধিকো বিশেষোধর্মেণহীনাঃ পশুভিঃ সমানা।।                                              
                                                              (মহা. শা. – ২৯৪, ২৯)

অর্থাৎ ! আহার, নিদ্রা, ভয় আর মৈথুন পশু আর মানুষ উভয়ের জন্যই একইরকম ভাবে প্রযোজ্য ও সেটাই স্বাভাবিক। পশু আর মানুষের মধ্যে যদি কোথাও তফাত থাকে তা হল ধর্মের। যে মানুষের মধ্যে ধর্ম নেই সে পশুরই সমান। মহাভারতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বাহ্য দৃষ্টিতে দেখলে আমরা দেখতে পাই, মানুষ আর পশুর কর্ম একইরকম। কিন্তু মানুষকে ধর্মের কারণেই উচ্চস্থান দেওয়া হয়। ধর্মই হল মানবের মহানতার কারণ। পশুর মধ্যে ধর্ম থাকে না, তাই যে মানুষের মধ্যে ধর্মের কিরণ প্রকট হয়নি, সেই মনুষ্যও পশুর সমান বলা চলে।

সঠিক পথ কোনটি 

ভিন্নতার দৃষ্টিতে দেখলে সংসারের মধ্যে প্রচলিত ধর্মকে দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যেতে পারে। এক শ্রেণীতে হলেন তারা, যারা বাহ্যিক কর্মের উপর জোর দিয়ে থাকেন আর দ্বিতীয় শ্রেণীতে তারা, যারা অনুভূত জ্ঞানের উপর জোর দেন। প্রথম শ্রেণীদের জন্য ধর্ম হল কোন বাহ্য শক্তির প্রতি আস্থা আর আচরণের প্রবৃত্তি। দ্বিতীয় শ্রেণীদের জন্য এটা হল অনুভূত জ্ঞান যাকে ঋষিগণ সর্বোপরি মহত্ত্ব দিয়েছেন।  প্রথম শ্রেণীদের দ্বারা কৃতকার্যকে পুরুষার্থ বলা হয় যেখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর ক্ষেত্রে আমরা তাকে পরমার্থ বলে থাকি। ঈশ্বর এবং জীবনের সম্বন্ধে কোন ব্যক্তি বিশেষের ধারণা গুলিকে প্রমাণ হিসাবে মানা যেতে পারে না। গভীরভাবে দেখলে এই দৃষ্টিকোণকে মানবিক দৃষ্টিকোণ বলেই মনে হয়। ধর্মকে মানবিক জীবনের স্বাভাবিক বিকাশ মানা যায়। কিন্তু সেটা কোন মার্গ যাকে, আমরা ধর্মের মার্গ বলতে পারি এবং যে মার্গে চলে জীবনকে কল্যানের দিকে অগ্রসর করতে পারি। যক্ষ যুধিষ্ঠিরকে এরকমই প্রশ্ন করেছিলেন – ‘কঃ পন্থা?’ সেটি কোন মার্গ? তখন যুধিষ্ঠির উত্তরে বলেন –

তর্কপ্রতিষ্ঠঃ শ্রুতয়ো বিভিন্নাঃ নেকো ঋষির্যস্য বচঃ প্রমানম্।
                              ধর্মস্য তত্বং নিহিতং গুহায়াং মহাজনো য়েন গতঃ স পন্থাঃ।।                                                         
                                  (মহা. বন. – ৩৯২/১১৫)

যদি আমরা তর্কের কথা ভেবে দেখি তাহলে দেখতে পাবো, তর্কের মধ্যেও কোনরকম স্থিরতা লক্ষ করা যায় না। প্রতিটি তর্ককে অন্য একটি তর্কের দ্বারা কাটা যেতে পারে। যার বুদ্ধি যত বেশি প্রখর হয় সে তত ভাল তর্ক করতে পারে। যেমন একবার এক শিকারী আকাশে উড়ন্ত একটি পাখিকে তার বন্ধুকের গুলির নিশানা বানায়। পাখিটিকে বন্ধুকের গুলি লাগে এবং সেটি মাটিতে পড়ে ছটফট করতে করতে কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায়। শিকারী অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দার্শনিকের দিকে তাকিয়ে দেখে। তখন দার্শনিক একটি তর্ক দিয়ে বললেন, আপনি বেকারই গুলিটিকে নষ্ট করলেন, এত উঁচু থেকে পড়লে এমনিতেই পাখিটি মারা যেত। শিকারী একথা শুনে অবাক হলেন। কিছুক্ষণ পড়ে সে আবার আকাশে উড়ন্ত পাখীদের উপর গুলি চালাল। এবারে গুলি কোন পাখিকেই লাগল না। দার্শনিক শিকারির দিকে তাকিয়ে বলল এবারে গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। তখন শিকারী তর্ক দিয়ে বলল, গুলি তো এবারেও পাখীকে লেগেছে কিন্তু গুলিলেগে মৃত পাখিও আকাশে উড়তে পারে। এখানে ভেবে দেখবার বিষয় হল না তো কোন পাখি আকাশ থেকে পড়ে মারা যেতে পারে, এবং না কোন পাখি গুলি লাগার পরে উড়তে পারে। কিন্তু একটি তর্ক দ্বিতীয় তর্ককে কেটে দিতে সক্ষম হয়েছে। একথা বলার তাৎপর্য হল এই, তর্কের দ্বারাও আমরা সত্য পর্যন্ত পৌঁছাতে পারি না। শ্রুতিগুলিতেও অনেকরকম ভাবে পরমাত্মার সম্পর্কে বলা হয়েছে। ঋষিদের দ্বারা দেওয়া প্রমাণও অনেক রয়েছে। কিন্তু “ধর্মস্য তত্বং নিহিতং গুহায়াং” ধর্মের তত্ত্ব হল অত্যন্ত গোপনীয়।  ধর্মের তত্ত্বকে চেনার জন্য মহাপুরুষ-গনের দ্বারা  বলা মার্গকে জানতে হবে, সেটি কোন মার্গ যার দ্বারা মহাপুরুষগণ জীবনে পরমানন্দকে জানতে পেরেছেন এবং জগতকে অজ্ঞানতার গর্ত থেকে উর্দ্ধে উঠিয়েছেন

ধর্মের তত্ব 

আজ মানুষ সেই বাস্তবিকতাকে না জানার কারণে বাইরের ব্যবহারকেই অর্থাৎ পুরুষার্থকেই ধর্ম ভেবে বসে রয়েছেন। মহাপুরুষগণ যখন এই সংসারে এসেছেন তখনই তার জীবনের সঙ্গে সর্বদা দুটি পক্ষ জুড়ে রয়েছে। একটি হল তাঁদের ব্যবহার আর অন্যটি হল তাঁদের পরমার্থ। মহাপুরুষ-গণের ব্যবহারের মধ্যে পরিবর্তন সময় ও দেশকালের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে থাকে কিন্তু তাঁদের পরমার্থ সবসময় একইরকম রয়েছে। যেমন প্রভু শ্রীরাম সম্পর্কে বলা হয়, তিনি ছিলেন এক পত্নীব্রতা পুরুষ, কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ১৬১০৮ জন রানী ছিলেন বলা হয়ে থাকে। বিশ্বামিত্র বশিষ্ঠের পুত্রগণকে বধ করা সত্ত্বেও বশিষ্ঠ শান্তই ছিলেন। কিন্তু অন্যদিকে পরশুরাম সম্পর্কে বলা হয়, যখন তার  পিতার বধ হয়েছিল তখন তিনি ক্ষত্রিয়দের বধ করার প্রতিজ্ঞা করেন এবং তিনি ২৮ বার পৃথিবীকে ক্ষত্রিয় বিহীন করে দিয়েছিলেন। শ্রীগুরুনানকদেব শান্তির প্রচার করেছিলেন কিন্তু অপরপক্ষে শ্রীগুরুগোবিন্দ সিংহ তাঁর জীবনকালে অস্ত্রশস্ত্রও ধারন করেন, ঔরঙ্গজেবের সেনাদের সাথে যুদ্ধও করেন সেই সঙ্গে নিজের শিষ্যদেরকেও যুদ্ধের জন্য প্রেরিত করেন।

মানবের ভাগ্যের এটাই বিড়ম্বনা, সে সবসময় বাহ্য-কর্ম তথা ব্যবহারকেই ধর্ম ভেবে নিয়ে সেইসমস্ত কার্যগুলিকেই পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভৌমাসুরের কারাগৃহে ১৬১০০ কন্যা বন্দী ছিল, সেটা জানতে পেরে তিনি এই ধরতিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণরূপে অবতরিত হন, কন্যাগণ দিনরাত শ্রীকৃষ্ণের শ্মরণ করতেন, তাঁরই ধ্যান করতেন। শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলছেন –

অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং য়ে জনাঃ পর্যুপাসতে।
তেষাং নিত্যাভিয়ুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম
                                               (গীতা – ৯/২২)


যারা একনিষ্টভাবে সদা আমারই চিন্তন করতে থাকে আমি তাঁদের যোগক্ষেমের ভার স্বয়ং বহন করি। পরমাত্মা নিজের ভক্তের সমস্ত বোঝা ও চিন্তাগুলিকে স্বয়ং সামলে নেন। ভৌমাসুরের কারাগৃহে ১৬১০০ কন্যা-গন ভৌমাসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কারাগৃহেই নিরন্তর ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই শ্মরণ করতেন, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকেই ডাকতেন। এই কারণে তাঁদের রক্ষার্থে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভৌমাসুরকে বধ করেন।  যখন সেই সমস্ত কন্যাদের বন্দীদশা থেকে মুক্ত করলেন তখন তারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণ ধরে প্রার্থনা করে বলেন, তারা এখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণকেই বরণ করে নিয়েছেন। তাই তিনি যেন তাঁদেরকে নিজের চরণে স্থান দেন এবং পত্নীরূপে স্বীকার করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের নিজের পত্নীরূপে স্বীকার করেন ও দ্বারকা-পুরীতে তাদেরকে স্থান দেন এবং তাঁদের সমস্ত সুখ প্রদান করেন। যারা স্বয়ং ভগবানকেই নিজের পতি বানিয়ে নিয়েছেন, নিজেদের তন মন তাঁরই চরণে সমর্পণ করে দিয়েছেন, তাঁদের আনন্দের আর সীমা কোথায়? গুরবাণীতে শ্রীগুরুঅর্জুনদেব খুব সুন্দর ঢঙ্গে বলেছেন –

জিতু ঘরি পিরি সোহাগু বনাইয়া । তিতু ঘরি সখীএ মংগলু গাইয়া ।
অণ্ড বিনোদ তিতৈ ঘরি সোহহি জো ধন কন্তি সীগারী জিউ ।
সাঁ গুনবন্তী সাঁ বড়ভাগণি । পুত্রবন্তী সীলবন্তি সোহাগণি ।
রূপবন্তী সা সুঘড়ি বিচখণি জো ধন কন্ত পিআরী জীউ ।
আচারবন্তি সাই পরধানে । সভ সিঙ্গার বণে তিসু গিআনে ।
সা কুলবন্তি সা সভরাই জো পিরি কৈ রঙ্গি সবারী জীউ ।
মহিমা তিস কী কহনু ন জায়ে । জো পিরি মেলি লই অঙ্গী লাএ ।
থিরু সোহাগু বড়ু অগমু অগোচরূ জন নানক প্রেম সাধারী জীউ ।
                                          (গুরুবাণী – ৫/৯৭)

শ্রীগুরু অর্জুনদেব জীবাত্মাকে স্ত্রী রূপে সম্বোধন করে বলছেন, যিনি পরমেশ্বরকেই পুরুষরূপে গ্রহণ করেছেন, তার ঘরেই মঙ্গল ধ্বনি উচ্চারিত হয় অর্থাৎ যিনি হরির যশগান গেয়ে তাঁকে নিজের পতিরূপে স্বীকার করেছেন, সমস্ত আনন্দ আর মনের বিনোদন সেই স্ত্রীর ঘরেই শোভা পায়। যে স্ত্রীকে পতি সুসজ্জিত করেছেন, সেই স্ত্রীই হলেন গুনবতী, তিনিই ভাগ্য-শালিনী, তিনিই পুত্রবতী, সুশীলা ও সোহাগিনী। যে জীব-রূপী স্ত্রী পরমাত্মা রূপী প্রিয়তমের আদরিনী, তিনিই রূপসী, তিনিই চতুর, তিনিই শুভ আচরণকারিনী, তিনিই স্ত্রী সকলের মধ্যে প্রধান। যার সমস্ত শৃঙ্গার জ্ঞানের দ্বারা তৈরি, তিনি কুলের অলঙ্কার, তিনি পটরানী। যিনি প্রিয়তমের প্রেমের মধ্যে লালিত পালিত হয়েছেন তার মহিমা তো ভাষার দ্বারা প্রকাশ করা যায় না। যাকে প্রিয়তম নিজের সাথে একাত্ম করে নিয়েছেন, যে স্ত্রীর পতি হলেন সেই অগম অগোচর পরমাত্মা, তিনি হলেন প্রেমে সেই পতির প্রতি সমর্পিত। এইজন্য তার সোহাগ হল স্থির। গুরু অর্জুন দেব যে স্ত্রীর মহিমা গুরু বাণীতে গেয়েছেন, সেই জীবাত্মা-রূপী স্ত্রীর পতি হলেন অগম অগোচর পরমাত্মা। ঠিক এইরকম অবস্থা সেইসব কন্যাদের হয়েছিল, যারা পারব্রহ্ম ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নিজের পতিরূপে নির্বাচিত করে নিয়েছিলেন। তাদের জগতে আর কীসের অভাব কীসেরই বা প্রয়োজন, যারা সব কিছুর দাতা পরমাত্মাকেই পতিরূপে পেয়ে গেছেন। কিন্তু আজ মোটা বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের চোখে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অসংখ্য স্ত্রী নজরে পরে, নিজেরাও অনেক স্ত্রী বানানোর প্রচেষ্টায় থাকেন। কিন্তু তারা এটা দেখতে পান না, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্ত্রী হবার আগে তারা সবাই   ভৌমাসুরের কারাগৃহে বন্দী অবস্থায় কত কষ্ট পাচ্ছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তো তাদের বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। সেই সমস্ত কন্যাগণ স্বেচ্ছায় শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে চয়ন করে নিয়ে জীবনের সমস্ত সুখের সহিত বাস্তবিক লক্ষ্যকে জেনে পরমাত্মার ভক্তির আনন্দ নিয়ে জীবনকে সফল বানিয়েছিলেন।

এরকম লীলার দ্বারা ভগবান ভক্তের কল্যাণ করেছিলেন। গোবর্ধন পর্বত ধারণ করে ইন্দ্রের মানভঙ্গ করেন।  প্রভু শ্রীরাম যেখানে এক পত্নিব্রতের নিয়ম পালন করেছিলেন সেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অসংখ্য পত্নী ছিলো। এসব ছিল তাদের বাহ্যিক ব্যবহার যেটা সেই সময় অনুসারে সঠিক ছিল।

শ্রীগুরু নানকদেব থেকে শ্রীগুরু অর্জুন দেব পর্যন্ত শান্তিতেই ধর্ম প্রচার হয় কিন্তু গুরু হরগোবিন্দ সাহেব অস্ত্রশস্ত্র উঠান এবং লড়াইও করেন। গুরু গোবিন্দ সিংহ যখন আসেন তখন তাকেও অস্ত্রশস্ত্র উঠাতে হয়েছে। ঔরঙ্গজেবের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচবার জন্য তিনি সৈন্যবাহিনীও তৈরি করেছিলেন। এটা ছিল তার পুরুষার্থ, তার ব্যবহার যা কিনা তৎকালীন সময়ের জন্য উপযুক্ত ছিল।  গুরুবাণীতে বলা হয়েছে –

বকত বিচারে সু বন্দা হোই। কুদরতি কর কে বসিয়া সোই।।

যত সন্ত, মহাপুরুষ, ঋষি, গুরু ও অবতারগণ এসেছেন তাঁদের ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। বাইরের ক্রিয়া একের সঙ্গে অন্যের ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাঁদের লক্ষ্য, তাঁদের পরমার্থ সবসময় একই রকম রয়েছে। হতে পারে তিনি প্রভু শ্রীরামের রূপে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রূপে, পরশুরাম, বশিষ্ঠ, রামানন্দ, সঙ্করাচার্য বা শ্রীগুরু নানকদেব অথবা শ্রীগুরু গোবিন্দসিংহ, কিমবা প্রভু শ্রী চৈতন্যদেব, অথবা শ্রীরামকৃষ্ণ। ইনাদের সবার ব্যবহারের মধ্যে তো ভিন্নতা লক্ষ্য করা যেতে পারে কিন্তু পরমার্থের মধ্যে নয়। সেই একই ধর্ম, যার জন্য অবতারগণ যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন রূপে আসেন। যখন-যখন মানব বাস্তবিকতা ভুলে অনেক মার্গ বানিয়ে ফেলে এবং জগতে ধর্মের নামে অধর্ম, বাদ-বিবাদ বাড়ে, তখন মানুষ ধর্মের মূল তত্ত্ব ভুলে নিজের খেয়াল খুশি মতো আচরণ করা শুরু করে। ধর্মের নামে আমাদের সামনে সমস্যা উৎপন্ন হতে থাকে। যখন মানুষ এরকম ভাবতে বাধ্য হয়ে যায় যে কোন মার্গে চলে আমরা এটা বলতে পারি যে আমরা ধর্মের পথে চলছি, ঠিক সেই সময়ই ভগবান অবতাররূপ ধারণ করেন। শ্রীরামচরিতমানসে বলা হয়েছে –

জব-জব হোই ধর্ম কৈ হানী। বাড়হিং অসুর অধম অভিমানী।
করহিং অনীতি যাই নহিং বরনী। সীদহিং বিপ্র ধেনু সুর ধরনী।
তব-তব প্রভু ধরি বিবিধ সরীরা। হরহিং কৃপানিধি সজ্জন পীরা।
                           (রা. চ. মা. – ১/১২১/৩, ৪)

অর্থাৎ যখন যখন ধর্মের হানি হয় আর নীচ প্রকৃতির অভিমানী রাক্ষসদের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং তারা এমন-এমন অন্যায় করে, যা ভাষায় বর্ণনাও করা যায় না। ব্রাহ্মণ, গরু, দেবতা, পৃথিবী ইত্যাদি কষ্ট পায়, তখন-তখন সেই কৃপানিধি প্রভু বিভিন্ন রকম দিব্য শরীর ধারণ করে আসেন এবং সজ্জনদের পীড়া হরণ করেন। এরকমটিই প্রভু শ্রীরামের সম্বন্ধে গোস্বামী তুলসীদাস শ্রীরামচরিতমানসে বলেছেন। শ্রীমদ্ভাগবতগীতাতেও প্রভু শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং অর্জুনকে বলেছেন –

যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লনির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্।।
পরিত্রানায় সাধুনাং বিনাশায় চ দূষ্কৃতাম্ ।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি য়ুগে য়ুগে ।।
                                               (গীতা – ৪/৭, ৮)

অর্থাৎ যখন-যখন ধর্মের গ্লানি হয় ও অধর্মের অতি বৃদ্ধি হওয়া শুরু হয়, তখন-তখনই আমি স্বয়ংকে সৃজন করি অর্থাৎ অবতরিত হই। সাধু ও সজ্জন পুরুষদের রক্ষার জন্য, দুষ্টদের বিনাশের জন্য এবং ধর্মের পুনঃ স্থাপনার জন্য যুগে-যুগে আমি অবতরিত হই। এখানে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে তাহলে অবতার রূপে কে আসেন।  রামায়ণে বলা হয়েছে –

শম্ভু বিরঞ্চি বিষ্ণু ভগবানা। উপজহি জাসু অংশ তে নানা।
এসেউ প্রভু সেবক বস অহই। ভগত হেতু লীলাতনু গহই।।
                                 (রা. চ. মা. – ১/১৪৪/৩, ৪)

যার অংশ থেকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বরের উৎপত্তি হয়, যে প্রভু সেবকের বশে থেকে ভক্তের কল্যাণ হেতু লীলা যোগ্য তন ধারণ করে নানা প্রকারের লীলা করে থাকেন। যে সজ্জনের কল্যাণার্থে মানবরূপে অবতরিত হন, সেই ধর্মের স্থাপনার জন্য। যে ধর্মের সম্বন্ধে শ্রীগুরু গোবিন্দ সিংহ দশম গ্রন্থে বলছেন –

হম ইহ কাজ জগত মো আএ । ধর্ম হেত গুরুদেব পাঠাএ ।।
যাঁহা তাঁহা ধর্ম বিথারো । দুষ্ট দোখিওন পকরি পছারো ।।
য়াহি কাজ ধরা হম জন্মং । সমঝ লেহু সাধু সভ মনমং।।
ধর্ম চলাবন সন্ত উবারন । দুষ্ট সভন কো মূল উপারন ।।
                                                     (দশম গ্রন্থ)

ধর্ম কি? গুরুদেব আমাদের ধর্মের বিস্তারের জন্য এবং দুষ্টের সংহারের জন্য জগতে পাঠিয়েছেন। অতএব এটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে আমরা জন্ম এই জন্যই নিয়েছি। সকলকে পরিষ্কার বুঝে নেওয়া উচিৎ, ধর্ম পরিচালনা করার জন্য, সৎ ব্যক্তিদের রক্ষার্থে এবং দুষ্টদের বিনাশের জন্যই আমাদের আগমন হয়েছে। গুরু গোবিন্দ সিংহ  কী প্রকারে দুষ্টদের বিনাশ করেছিলেন। তিনি যে ধর্মের চর্চা করেছেন সেটি কোন ধর্ম? আজ আমরা ধর্মের ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে করে থাকি, যেখানে ধর্ম অনেক হতেই পারেনা। আজকাল মানুষ এরকমের উদাহরণ দিয়ে থাকে, গন্তব্য স্থান যদি দিল্লি হয় তাহলে তুমি যেদিক দিয়ে যাও না কেন, ফরিদাবাদ থেকে যাও অথবা গাজিয়াবাদ থেকে, তার মধ্যে কোন তফাত নেই। একটু ভেবে দেখা উচিৎ দিল্লি তো একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থিত দিল্লির ক্ষেত্রে সেকথা অবশ্যই খাটে কিন্তু পরমাত্মা তো কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থিত নয় বরং তিনি হলেন সর্বব্যাপী, তাহলে বিভিন্ন পথের প্রয়োজন হবে কেন? মানুষ সর্বদাই ভুলবশত মিথ্যা কল্পনা এবং ক্রিয়া-কলাপ গুলিকেই ধর্ম বলে মেনে নিয়েছে। এই কারণেই ধর্মের নামে ব্যর্থই যতসব ঝগড়া এবং বিবাদ শুরু হয়।  মানুষ যদি জীবনে শাশ্বত ধর্মকে চিনে নেয় তাহলে সমস্ত বিবাদ আপনা থেকেই সমাপ্ত হয়ে যাবে।

একবার এক গ্রামে হাতি এসেছিল। গ্রামের লোকেরা প্রথমবার হাতি দেখে তার খুব চর্চা করা শুরু করে। হাতির চর্চা পাশের গ্রামেও পৌঁছে যায়। সেই গ্রামে চারজন অন্ধ ব্যক্তি ছিল। তারাও হাতি দেখতে পাশের গ্রামে পৌঁছে যায়। গ্রামে পৌঁছে তারা হাতির কাছে গেলো। তাদের চোখ তো নেই তাই স্পর্শ করেই  হাতিটা দেখতে কেমন তা জানবার চেষ্টা করছিল। যখন তারা বাড়ি ফিরছিল পথে একজন অন্ধ বলে হাতিটি দড়ির মতোই সরু ছিল। কেননা সে হাত দিয়ে হাতির লেজ স্পর্শ করে দেখেছিল। সেকথা শুনে দ্বিতীয় অন্ধ বলে ওঠে, না ভাই হাতিটা তো কুলোর মতো চ্যাপ্টা ছিল। আসলে সে হাত দিয়ে হাতির কান স্পর্শ করে দেখেছিল। ততক্ষণে তৃতীয় অন্ধ বলে ওঠে তোমরা দুজনেই ভুল বকছ, হাতিটা ছিল আসলে একটি খুব মোটা দড়ির মতো। কারণ সে হাত দিয়ে হাতির শুঁড় ছুঁয়ে দেখেছিল। যে অন্ধ ব্যক্তিটি হাতে হাতির পা স্পর্শ করে এসেছিল সে বলে ওঠে তোমরা তিনজনেই মিথ্যা কথা বলছ হাতিটা ছিল ঠিক স্তম্ভের মতো মোটা। চারজনেই নিজের নিজের কথাটিই সত্যি বলে দাবী করে আর ঝগড়া শুরু করে দেয়। ঝগড়া করতে করতে অবস্থা মারামারি হবার উপক্রম হয়। ততক্ষণে কিছু ব্যক্তি এসে তাদেরকে ঝগড়া থেকে বিরত করে এবং লড়াইয়ের কারণ জানতে চায়। কারণ জানার পর তারা অন্ধদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ওই অবস্থায় কে কার কথা শুনে। একে অন্যের কথা শুনবার জন্য তৈরিই নয়, সবাই বলে আমি নিজে হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখেছি। তখন তাদের মধ্যে একজন ব্যক্তি তৎপর হয়ে অন্ধদের চোখের চিকিৎসার জন্য সবাইকে একজন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের নিকটে নিয়ে গিয়ে তাদের চোখের চিকিৎসা করিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলেন এবং তারপর আবার সবাইকে হাতিটির সামনে নিয়ে গেলেন এবং বললেন, এবার তোমরা নিজেরাই দেখ হাতিটি আসলে কেমন দেখতে। যখন চারজনেই হাতিটিকে দেখল এবং তারা নিজেদের মূর্খতা বুঝতে পারে এবং হাঁসতে শুরু করে। সবাই বলে যাকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের ভেবে বিবাদের সম্মুখীন হয়েছিলাম আর বেকারই ঝগড়া শুরু করেছিলাম সেটি আসলে একটিই। ঠিক এইরকম অবস্থাই ধর্মের ক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষ করে থাকে। সেকারণেই বার-বার সন্ত মহাপুরুষ তথা অবতারগণের আসবার প্রয়োজন দেখা দেয়। যখন-যখন মানুষ মিথ্যা কল্পনাগুলিকেই ধর্ম হিসেবে ধরে নেয়, তখনই ঝগড়া বিবাদ এসে পড়ে।

একবার বিষ্ণুর মতাবলম্বী পাণ্ডাদের সঙ্গে শিবের মতাবলম্বী পাণ্ডাদের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। ভগবান বিষ্ণু পন্থীরা বলে বিষ্ণুই হলেন সবচেয়ে বড় আর শিব পন্থীরা বলেন যে ভগবান শিবের চেয়ে বড় কেউ নেই। দুই পক্ষই নিজের নিজের ইষ্টদেবকে বড় বলে দাবী করে লড়াই শুরু করে। একজন বলে, বিষ্ণুই হল সবচেয়ে বড়, তখন অন্যজন বলে না, শিবই হলেন সবচেয়ে বড়। দুজনে যখন লড়াই করছিলেন তখন সেখানে স্বামী বিবেকানন্দ পৌঁছান। তিনি কোনোরকমে তাদের লড়াই থেকে বিরত করিয়ে ঝগড়ার কারণ জানতে চাইলেন। তখন তারা দুই পক্ষই স্বামী বিবেকানন্দকে বলে আপনিই এই ঝগড়ার মীমাংসা করুন আর বিষ্ণু বড় না শিব বড় তা পরিষ্কার করে বলুন। তখন স্বামী বিবেকানন্দ বিষ্ণু মতাবলম্বীদের জিজ্ঞাসা করলেন তোমরা কি ভগবান বিষ্ণুকে দেখেছ? তারা উত্তরে বলে না, দেখিনি তো। এরপর তিনি শিব মতাবলম্বীদের প্রশ্ন করলেন তোমরা ভগবান শিবকে জেনেছ কি? তোমরা কি শিবকে দেখেছ? তারাও উত্তরে বলে না, দেখিনি। তখন স্বামী বিবেকানন্দ তাদের বললেন তোমরা যাঁকে জানো না, তোমরা যাঁকে দেখনি তাঁর সম্বন্ধে তোমরা কী করে দাবী করে বলছ, কে ছোটো আর কে বড়? আমাদেরকেও এটা বিচার বিবেচনা করে দেখতে হবে যে ধর্মের বিষয়ে আমরা কতটুকু জানি। ব্রিহন্নারদীয়তে বলা হয়েছে বিষ্ণুই  হলেন শিব আর আর শিবই হলেন বিষ্ণু? যিনি তাদের আলাদা আলাদা বলে মনে করেন তিনি নরকে যান।

হরি রূপী মহাদেবো লিঙ্গরুপী জনার্দনঃ ।
ঈষদপ্যন্তরং নাস্তি মেদকৃন্নরকং ব্রজেৎ ।।
এক অন্য স্থানেও বলা হয়েছে,
য়ো বৈ বিষ্ণুঃ স বৈরুদ্রো য়োরুদ্রোঃ স পিতামহঃ ।
এক মূর্তিস্ত্রয়ো দেবা রুদ্র বিষ্ণু পিতামহাঃ ।।

আমরা যাকে বিষ্ণু বলে জানি, তিনিই রুদ্র আর যিনি রুদ্র তিনিই ব্রহ্মা। রুদ্র, বিষ্ণু এবং ব্রহ্মার রূপে একই শক্তি  কাজ করছে। যখন যখন সেই শক্তি সন্ত মহাপুরুষের রূপে এসেছেন  তারা কেবল ধর্ম স্থাপনের জন্যই এসেছেন। কিন্তু যখন তারা তাদের সন্দেশ দিয়ে চলে গেছেন, তখন তাদের নামে মানুষ এক নতুন নতুন ধর্ম বানিয়ে নিয়েছেন ত্রেতাযুগে যখন প্রভু শ্রীরাম আসেন তখন মানুষ রামায়ণ পায়। দ্বাপরে যখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আসেন তখন মানুষ পায় শ্রীমদ্ভাগবতগীতা। যখন শ্রী গুরু গোবিন্দ সিংহ আসেন তখন শ্রী গুরুগ্রন্থ সাহিব পাওয়া যায়। এখন এখানে বিচারণীয় বিষয় হল এই, ধর্মগ্রন্থগুলিকেই কী আমরা ধর্মের স্থাপনা বলে মনে করব? না! অবশ্যই নয়

এই রকম সিদ্ধান্তে আসা উচিত হতে পারে না। কারণ এরকম ভেবে নেবার অর্থ হল, ধর্ম যুগের বা সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বদলাতে থাকে। প্রথমত ত্রেতাতে একরূপে, তারপরে দ্বাপরে নতুন-রূপে এসেছে আর কলিযুগে অন্য আরএকটি  রূপে এসে গেছে। যদি তাই হয় তাহলে এসবের পূর্বে ধর্মের স্বরূপ কিরূপ ছিল? যদি আজ আমরা কাউকে ধর্মের স্বরূপ সম্বন্ধে প্রশ্ন করি, তাহলে সে খুব সহজেই বলে দেয় যে অমুক-অমুক ধর্মের এই-এই পরিচয়। এই ধর্মের লোকেরা কোন ধর্ম গ্রন্থকে মানে আর ওই ধর্মের লোকেরা কোন ধর্ম গ্রন্থকে মেনে চলে ইত্যাদি। কে হলেন বৌদ্ধ, কে হিন্দু, কে বা শিখ, কে মুসলমান, কে খৃষ্টান ইত্যাদি। খুব সহজেই এইভাবে সবার পরিচয় দিয়ে বলতে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হল এসবই কী ধর্ম? যদি এগুলোই ধর্ম হয় তাহলে সম্প্রদায় কোনগুলি ? ধর্ম আর সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়ধর্ম তো অনেক হতেই পারে না। সম্প্রদায় অনেক হতে পারে, মত অনেক প্রকার হতে পারে, কিন্তু যেখানে ধর্মের কথা বলা হচ্ছে এটা তো সদা সর্বদা একই ছিল, আছে এবং থাকবেও। ধর্ম সেটাই যা কিনা অনাদি, গুরবাণীতে গুরু তেগ বাহাদুরের একটি শব্দের উল্লেখ আছে, তিনি বলেছেন –

নাহিন গুনু নাহিন কছু বিদিআ ধরমু কউনু গজি কীনা।
নানক বিরদু রাম কা দেখহু অভৈ দানু তিহ দীনা।।
                                         (গুরবানী – ৯/৯০২)

পুরাণের একটি গল্পে একবার কুমীর একটি হাতির পা ধরে ফেলে। হাতি নিজেকে বাঁচানোর জন্য যথা সম্ভব চেষ্টা করেও বিফল হয়। তখন সে প্রভুকে শ্মরণ করে। প্রভু তখন প্রকট হয়ে কুমিরকে মেরে হাতিকে নির্ভয় প্রদান করেন। শ্রীগুরু তেগবাহাদুর বলেন, সেই হাতির মধ্যে তো কোন গুণই ছিল না। সে কোন বিদ্যা জানতো? সে কোন ধর্মের আশ্রয় নিয়ে ছিল, যে কারণে প্রভু তাকে রক্ষা করলেন। বলা হয় “ধর্মো রক্ষতি রক্ষিতঃ।” এখানে কোনো বিশেষ ধর্মের কথা বলা হয়নি, বরং সেই শাশ্বত ধর্মের সম্বন্ধে বলা হয়েছে যা সকল-রূপে অভিব্যক্ত রয়েছে আর তাহলো, পরমাত্মাকে পাওয়া এবং তাঁর সাথে  নিজের চির সম্পর্ক স্থাপিত করা। সেটাই ধর্ম যা সত্যযুগ থেকে কলিযুগ পর্যন্ত একই রয়েছে। যা দেশ ও কালের সাপেক্ষে অপরিবর্তিত থাকে। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, “ধর্মঃতু সাক্ষাৎ ভগবৎ প্রণীতঃ।” সেই মার্গ যার দ্বারা পরমাত্মার প্রাপ্তি হতে পারে, সেটাই ধর্ম যার দ্বারা পরমাত্মা পর্যন্ত পৌঁছানো যেতে পারে, সেই ধর্মের রচনা স্বয়ং ভগবান করেন। ধর্মের সেই রূপ কোনটি যার সম্বন্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন –

সর্বধর্মান্পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।
অহং ত্বা সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা সূচঃ ।।
                                           (গীতা ১৮/৬৬)

হে অর্জুন! তুমি সব ধর্ম ছেড়ে অর্থাৎ যে সমস্ত মিথ্যা মান্যতাগুলিকে ধর্ম ভেবে বসে আছো, যে সমস্ত বাইরের কর্মকাণ্ডকে তুমি ধর্ম মনে করে বসে আছো, সেইসব মিথ্যা ধারণাগুলিকে পরিত্যাগ করে আমার শ্মরণে এসো। তোমায় সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করে দেব। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যিনি ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা, অর্জুনকে সম্বোধন করে বলছেন, হে অর্জুন! তুমি আমার শ্মরণে এসো। শ্রীকৃষ্ণের শ্মরণ অর্থাৎ যিনি ধর্মের শ্মরণে এসে গেছেন, তারই বাঁচার সম্ভাবনা আছে। সেই কেবল পাপের সমুদ্রে সাঁতার দিতে পারবে। ধর্মের নজরে কাউকে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খৃষ্টান ইত্যাদি বিভিন্নরূপে দেখা যায় না, বরং ধর্ম তো সবার মধ্যেই সেই জ্যোতিকে দর্শন করে। যেমনটি কান্হাইয়া ভাই-এর সাথে ঘটেছিল। কান্হাইয়া ভাই শ্রীগুরু গোবিন্দ সিংহের শিষ্য ছিলেন। যখন যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি জল পান করানোর সেবা পেয়েছিলেন তখন জল দেবার সময় তিনি এটা একবারও ভাবেন নি যে কে হিন্দু আর কে মুসলমান। তিনি সবাইকে বিনম্র ভাবে জলপান করাচ্ছিলেন। কিছু শিষ্য বিষয়টি নিয়ে গুরু গোবিন্দ সিংহ এর কাছে গিয়ে নালিশ করে, আমরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করছি, তাদের মারছি এদিকে কান্হাইয়া ভাই তাদেরকেও জল পান করাচ্ছে, এটা তো উচিত হচ্ছে না।

তখন শ্রী গুরু গোবিন্দ সিংহ বললেন, ঠিক আছে যদি এটা উচিত না হয় তাহলে বরং আমরা ওকেই জিজ্ঞাসা করে দেখি না কেন, সে এমনটি কেন করছে? কান্হাইয়া ভাইকে ডেকে শ্রী গুরু গোবিন্দ সিংহ প্রশ্ন করলেন, তখন কান্হাইয়া ভাই উত্তরে বলেন, মহারাজ আমি নিজেকে আপনার চরণে সমর্পণ করে দিয়েছি এবং যে দৃষ্টি আপনি আমায় প্রদান করেছেন তার দ্বারা আমি না তো কাউকে হিন্দু দেখি আর না কাউকে মুসলমান। আমি সবার মধ্যে আমার গুরুদেবকেই দেখতে পাই। আমার গুরু আমার কাছে যদি জল চায়, তাহলে আমি কী করে তাঁকে মানা করব। শ্রী গুরু গোবিন্দ সিংহ হাঁসতে হাঁসতে তাকে নিজের আলিঙ্গন করে বললেন তুমিই আমার সত্যিকারের সেবক যে আমাকে বাস্তবিক রূপে চিনতে পেরেছে। গুরুবাণীতে কবীর দাসও বলেছেন  –

অবলি অলহ নূরূ উপাইয়া কুদরতি কে সভ বন্দে।
এক নূর তে সভু জগু উপজিআ কউন ভলে কো মন্দে।।
                                         (গুরুবাণী - ১৩৪৯)

শ্রী গুরু গোবিন্দ সিংহ যে ধর্মের স্থাপনা করেছিলেন, বাইরের জগতের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিল না। তা ঐ সময়ে প্রয়োজন ছিল। দশম গ্রন্থে বলা হয়েছে –

ভেখ দিখাএ জগত কো লোগন কো বস কীন।
অন্ত কাল কাতী কট্-য়ো বাস নরক মেঁ লীন ।।

দুনিয়াকে তো বেশভূষা দেখিয়ে মনজয় করে নিজের বশে করে নিতে পারো কিন্তু অন্তিম কালে বেশভূষা তো দূরের কথা এই শরীরও সঙ্গে যাবে না। “ধর্মরাজ জব লেখা মাঙ্গে তব কৌন তেরা পরদা ঢাকে।” ধর্মরাজের দরবারে ধর্মের দ্বারাই রক্ষা হতে পারে এছাড়া আর কোন উপায় নেই। এখন সেই বাস্তবিক ধর্ম সম্পর্কে জানতে হবে। ‘ধর্ম’ শব্দটি সংস্কৃতের কৃদন্ত প্রকরণে ‘ধৃ’ ধাতুর সঙ্গে ‘মন্’ কৃদন্ত প্রত্যয় একযোগে মিলে তৈরি। “ধারণাদ্ ধর্মং ইতি আহুঃ।” অর্থাৎ যাকে ধারণ করা যায় তাকে ধর্ম বলা হয় ধারণ কাকে করা হয়, সে কে যা ধারণ করার যোগ্য? কাকে ধারণ করার পর আমরা ধার্মিক হতে পারি ? কাকে ধারণ করার পর মুনি, ঋষি ও সন্তগণ ধর্মের মহিমার গুণগান করেছেন? কাকে ধারণ করার পরে আমাদের ভিতর ধর্মের লক্ষণ প্রকাশিত হয়? সেটা কোন ধর্ম যাকে ধারণ করার পরে আমরা বলতে পারি, আমরা কল্যাণের পথে চলছি? আমরা সেই পথে চলছি যার বর্ণনা আমাদের ঋষি, গুরু এবং অবতার পুরুষগণ করেছেন। সেই ধর্মের সঙ্কেত আমরা যজুর্বেদের একটি মন্ত্রে পাই যাকে আমরা ‘গায়ত্রী মন্ত্র’ বলি। গায়ত্রী অর্থাৎ “গায়াং প্রাণান ত্রায়তে ইতি গায়ত্রী।” গায়ত্রী হল সেই শক্তি যা আমাদের প্রাণ রক্ষা করছে এবং সেটা হল সেই মন্ত্র যা অত্যধিক গাওয়া হয়ে থাকে –

ঔঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ তত্সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি ধিয়ো য়োনঃ প্রচোদয়াত্ ।
                                               (যজু – ৩/৩৫)

ঔঁ শব্দটি অ, উ, ম অর্থাৎ অ-কার, উ-কার এবং ম-কার এই তিনটি শব্দের যোগে তৈরি হয়েছে। এর অর্থ এই, সেই পরমাত্মা সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিমান, এবং সর্বান্তর্যামী। যাকে ল্যাটিন ভাষায় ওমনিপ্রেসেন্ট, ওমনিপোটেন্ট এবং ওমনিশিএন্ট বলা হয়ে থাকে।
। গুরুবাণীতে বলা হয়েছে –

ইহু সরীরূ সভু ধরমু হৈ জিসু অন্দরি সচে কী বিচি জোতি ।
গুহজ রতন বিচি লুকি রহে কোই গুরমুখি সেবকু কঢৈ খোতি ।
সভু আতম রামু পছাণিআ তাং ইকু রবিআ ইকো ওতি পোতি ।
ইকু দেখিআ ইকু মঁনিআ ইকো সুণিআ স্রবণ সরোতি ।
জন নানক নামু সলাহি তূ সচু সচে সেবা তেরী হোতি ।।
                                          (গুরবাণী - ৩০৯)

বলা হয়, এই শরীরই হল সেই ধর্ম যার মধ্যে পরমাত্মার জ্যোতি বিদ্যমান রয়েছে। তা এতই গভীরে রয়েছে, এতই গুপ্ত যে বিরল ব্যক্তি, একমাত্র যিনি সদগুরুর সম্মুখীন হন, সেই জ্যোতির প্রাপ্তি করতে পারেন। তখনই তিনি জানতে পারেন, সমস্ত জায়গায় সেই একই পরমাত্মা বিরাজমান রয়েছেন। এতে ধর্মের সম্পর্কে পরিষ্কার হয়ে যায়, ধর্ম অর্থাৎ ধারণ করা হয় সেই জ্যোতিকে। বেদ মন্ত্রের দ্বারা এবং গুরবাণীর শ্লোকের দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায়, সেই ব্যক্তিই ধার্মিক, তিনিই ধর্মকে ধারণ করেছেন যিনি পরম-জ্যোতিকে এই শরীরের ভিতরেই জেনে গেছেন। তারই বুদ্ধি সন্মার্গের দিকে অগ্রসর হয়, তখন তিনি সবার মধ্যে সেই “এক”-কে চিনতে পারেন। শ্রী গুরু গোবিন্দ সিংহ বলেছেন –

কোউ ভয়ো মুণ্ডয়া সন্যাসী, কোউ জোগী ভয়ো,
কোউ ব্রহ্মচারী কোউ জতী অনুমানবো ।
হিন্দু তুরক কোউ রাফজী ইমামসাফী,
মানস কী জাত সভৈ ঐকে পহিচানবো ।
করতা করীম সোঈ রাজক রহীম ওঈ,
দুসরো ন ভেদ কোঈ ভূল ভ্রম মানবো ।
এক হী সেব সব হী কে গুরু দেব এক,
এক হী সরূপ সভৈ এক জোতি জানবো ।
                                                        (দশম গ্রন্থ)

কেউ মাথা মুণ্ডন-কারী সন্যাসী হোক অথবা কেউ যোগী, ব্রহ্মচারী, হিন্দু অথবা মুসলমান হোক বাস্তবে সবাই হল মানুষ (একে বেদেও বলা হয়েছে, মনুর্ভব মনুর্ভব অর্থাৎ মানুষ হও)। আগে বলা হয়েছে, যিনি সবকিছু  করেন এবং সবকিছু দেন আসলে তিনিই হলেন একই পরমাত্মা। এতে কোন রকম ভেদাভেদ নেই। যেরকম আমারা বলতে পারি, চোখের দ্বারা দেখে থাকে। কিন্তু যখন কোন ব্যক্তির মৃত্যু হয় চোখ থাকা সত্ত্বেও সে দেখতে পায় না। কিন্তু সেই চোখ যদি কোন অন্ধ ব্যক্তিকে দান করে দেওয়া হয় তাহলে সেই মৃত দেহের চোখটি তখন দেখতে পারে। বলার তাৎপর্য হল, চোখ তো কেবল দেখার একটি মাধ্যম মাত্র। ঠিক এই প্রকার এই সংসারও কেবল একটি মাধ্যম মাত্র, দাতা তো সেই পরমাত্মাই। অতএব আজ পর্যন্ত যত ভক্ত এবং সন্ত হয়েছেন তারা সকলে পরমাত্মারই সেবা করেছেন এবং তাঁরা প্রভুর সাক্ষাৎ করিয়ে দেবার একমাত্র শক্তিকে গুরু বলে মেনেছেন, যিনি যুগে যুগে মানবের কল্যাণের জন্য অবতরিত হয়েছেন। তাঁর বাস্তবিক রূপ একটিই, যে স্বরূপকে সমস্ত ধার্মিক গ্রন্থে জ্যোতি স্বরূপ বলা হয়েছে।

ধর্ম কি? বেদে স্পষ্ট-রূপে বলা হয়েছে, সেটি কোন মার্গ যাকে জানার পর মানুষ মৃত্যুর ওপারে পৌঁছে যায়, যেখান থেকে সে আর মৃত্যুর সাগরে পথভ্রষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়ায় না।  এছাড়া আর অন্য কোন রাস্তা সেখানে পৌঁছায় না। যজুর্বেদে বলা হয়েছে –

বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ
তমেব বিদিত্ত্বাতি মৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্দতেওয়নায় ।।
                           (যজু – ৩১/১৮, শ্বেত. – ৩/৮)

জ্ঞানী-পুরুষ বলেন, “আমি সেই মহান পরম পুরুষকে জানি যিনি হলেন সূর্যের মতো স্বয়ং আলোকোজ্জ্বল জ্যোতিস্বরূপ এবং অন্ধকারের অতি ‘পরে, যাকে জেনে নেবার পর এই মৃত্যু সাগরের ওপারে পৌঁছানো যেতে পারে। পরম পদের প্রাপ্তির জন্য তাঁকে জানা ছাড়া আর অন্য কোন দ্বিতীয় রাস্তা নেই।” এই হল সেই রাস্তা যার বিষয়ে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন “মহাজনো য়েন গতঃ স পন্থাঃ ।” এটাই সেই রাস্তা যার মধ্য দিয়ে সমস্ত মহাপুরুষগণ চলে গেছেন। সেই আলোক যাকে ভৌতিক জগতের কোন আলোই আলোকিত করতে পারে না। সেই আলোকের সম্পর্কে বলা হয়েছে –

ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং  নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোওয়মগ্নিঃ ।
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি ।।
                      (শ্বেত. – ৬/১৪, কঠো. – ৫/১৫)

সেথায় না সূর্য আলো দেয়, না তারারা, না চাঁদ, আর না তো অগ্নি আলোকিত করতে পারে । সূর্য, চন্দ্র, তারা এবং অগ্নিতে যে আলো আমরা দেখতে পাই তা সবই সেই আলোর দ্বারাই আলোকিত হচ্ছে ।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে –

একো হংসো ভুবনস্যাস্য মধ্যে স এবাগ্নিঃ সলিলে সন্নিবিষ্টঃ ।
তমেব বিদিত্ত্বাতি মৃত্যুমেতি নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেওয়নায় ।।
                                         (শ্বেত. – ৬/১৫)

এই ব্রহ্মাণ্ডে এক জ্যোতি স্বরূপ পরমাত্মাই হলেন পরিপূর্ণ, তিনিই জলের মধ্যে অগ্নি-রূপে অন্তর্নিহিত রয়েছেন। শাস্ত্রেও অনেক জায়গায় এই কথাটিই উল্লিখিত রয়েছে যে সমুদ্রে বড়বানল অগ্নি আছে যা সবসময় নিজের কাজে লেগে থাকে। ন্যায়ের মধ্যে থাকা জল তত্ত্বের কারণে সেই অগ্নি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। ঠিক এই রকমই জগতকে বিপরীতরূপে দেখার কারণে সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিতে পরমাত্মা কীরূপে ব্যাপ্ত রয়েছেন তা বোঝা যায় না। কিন্তু যিনি সেই পরমব্রহ্মের অচিন্ত্য অদ্ভুত শক্তির রহস্যকে জানেন, তাঁর কাছে সেই পরমাত্মা প্রত্যক্ষ-রূপে সর্বত্র পরিপূর্ণ এবং সবকিছু সৃষ্টির কারণ বলে প্রতীত হয় । সেই সর্ব শক্তিমান পরমাত্মাকে জেনেই মনুষ্য এই মৃত্যুর সাগরকে পার হতে পারবে। তাঁকে পাওয়ার অন্য কোন দ্বিতীয় রাস্তা নেই।

ধর্মের সম্বন্ধ সেই ঈশ্বরীয় ধারনার সাথে যুক্ত, যার দ্বারা পরমাত্মাকে জানা যায়। যারা এরকম ধর্মকে ধারণ করে পরমাত্মাকে তত্ত্বরুপে জেনেছেন বাস্তবে তারাই হলেন ধার্মিক পুরুষ। একবার স্বামী বিবেকানন্দকে কেউ প্রশ্ন করেন, ধর্ম কাকে বলে?
What is religion ?
তখন উত্তরে বিবেকানন্দ বলেন –
Religion is the realization of God.
পরমাত্মার সাক্ষাৎকার করে নেওয়া ও অনুভব করে নেওয়াই হল ধর্ম। ধর্মের আর কোন পরিভাষা হতে পারে না। বাকী সব তো ধর্মের গুন, যা ধর্ম জাগরণের পরে মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বিকশিত হতে থাকে।

More Related Topics You may Like to Read


No comments:

Post a Comment