ব্রহ্মজ্ঞান কি
ব্রহ্মজ্ঞান = ব্রহ্ম+জ্ঞান, ব্রহ্ম অর্থাৎ ঈশ্বর, জ্ঞান অর্থাৎ জানা, যে প্রক্রিয়ায় ইশ্বরকে
জানা যায় তাকেই ব্রহ্মজ্ঞান বলে।
ব্রহ্মজ্ঞান এমন এক পক্রিয়া যার দ্বারা দীক্ষার সময়েই তৃতীয়
নেত্র (Divine Eye) খুলে ইশ্বরকে (আত্মা- Particle of
God) প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করা যায়।
যখন পূর্ণ গুরু একজন ঈশ্বর
অনুসন্ধানকারীকে এই ‘তত্বজ্ঞান’ প্রদান করেন, সেই সময়েই তার তৃতীয় নেত্র খুলে
যায় এবং তিনি নিজের ভিতর দিব্যজ্যোতির (আলোর) দর্শন করেন। অর্থাৎ ব্রহ্মজ্ঞান হল পূর্ণ গুরুর কৃপায়
একজন জিজ্ঞাসুর অন্তঃকরণে ঈশ্বরের জ্যোতিরূপের তৎক্ষণাৎ দর্শন। সাথে সাথেই অনহদ নাদ, ঈশ্বরের বাস্তবিক
নাম প্রকট হয় ও দিব্য অমৃত রস পান করা যায়
দিব্য জ্যোতি: এটি প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বরের নিরাকার
রূপ, যা আলোর
আকারে, আমাদের
অভ্যন্তরে বিরাজ করে। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মে একে
বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়েছে , যেমন প্রকাশ, জ্যোতি, নূর, Devine
Light ইত্যাদি। কঠোপনিষদে সেই অলৌকিক প্রকাশের সম্বন্ধে বলা
হয়েছে,
ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্র তারকং নেমা
বিদ্দ্যুতো ভান্তি কুতওয়মগ্নিঃ
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং
বিভাতি।।
(কঠউপনিষদ – ২/২/১৫)
সূর্য
তাঁকে প্রকাশিত করতে পারে না, আর না তো চন্দ্রের আলোক তাঁকে প্রকাশিত করতে পারে।
বিদ্যুতের আলোও তাঁকে প্রকাশিত করতে পারে না, আর ভৌতিক জগতে প্রকটিত কোনও প্রকারের
অগ্নিই তাঁকে প্কাশিত করতে পারে না। বরং এই সূর্য, চন্দ্র, তারাগণ এবং অগ্নি
ইত্যাদির মধ্যে যে আলোকের অনুভব হয় সেটাও তাঁরই আলোক যা প্রত্যেক মনুষ্যের হৃদয়ে
তাঁর আত্মার রূপে বিদ্যমান। সেই আলোকেই জানার প্রয়োজন রয়েছে। যেরূপ ভৌতিক সূর্যও
রয়েছে তেমনিই প্রত্যেক মানুষের অন্তঃকরণে দিব্য সূর্য বিদ্যমান, সেই সূর্য আমাদের
আধ্যাত্মিক জগতে শক্তি প্রদান করে। যে ব্যক্তির অন্তরে এই অলৌকিক দিব্য আলোক প্রকটিত
হয়, তাঁর সাংসারিক কর্মের মধ্যেও এক দিব্যতা এসে যায়। তখনই মানব জীবনের বাস্তবিক
দিশাকে জানতে পারে।
অনহদ নাদ: এটি চিরন্তন সঙ্গীত যা আমাদের
মধ্যে অবিরাম বেজে চলেছে একে ‘অনহদ নাদ’ বলা হয়। বিভিন্ন
ধর্মীয় স্থানের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, এর প্রতীক
বিনা বাজাএ নিস দিন বাজে ঘণ্টা শঙ্খ নগারী রে।
বহরা সুন সুন মস্ত হোত হৈ তন কী খবর বিসারী রে।।
না
বাজিয়েও সেই ঘণ্টা, শঙ্খ, নগারী বাজছে যেটা শুনে কালা ব্যক্তিও আনন্দিত হয়ে যায়।
এই নাদই ছিল যা দ্বাপর যুগে গোপীগণ শুনতেন। যা শুনে তারা আনন্দিত হয়ে উঠতেন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠতেন এবং দৌড়ে চলে যেতেন।
কিন্তু সেই বাঁসুরী গোপীরাই কেন শুনতে পেতেন কারণ গোপীরা সেই ব্রহ্মজ্ঞান
পেয়েছিলেন। অতএব সেই বাঁসুরী গোপীগণ বাহ্য জগতে নয় বরং অন্তর্জগতে শুনতেন। সেই
বাঁসুরী কেবল দ্বাপরেই নয় বরং আজকেও বাজছে। প্রয়োজন হল এমন সতগুরুর যাঁর কৃপার
দ্বারা আজও আমরাও সেই বাঁসুরীর ধুন শুনতে পারবো। যা আমাদের অন্তরে নিরন্তর বেজে
চলেছে। যিনি আমাদের সেই কীর্তন শুনিয়ে দেবেন তিনিই হলেন পূর্ণ সতগুরূ।
নাম: নাম মহাবিশ্বে উদ্ভাসিত আদি স্পন্দন (Primordial Vibration) এটি পৃথিবীর সমস্ত জীবের অস্তিত্বের মুল আমাদের প্রাণের মধ্যে বিলীন
আছে যাকে নাম, শব্দ
ইত্যাদি বলা হয়।
কোটি নাম সংসার মেঁ তাঁতে মুক্ত না হোই।
আদি নাম জো গুপ্ত জপৈ বিরলা বুঝে কোই।।
(কবীর)
এই সংসারে প্রভুকে কোটি নামে ডাকা হয়।
কবীর বলেন সেইসব নামের দ্বারা মুক্তি হতে পারে না। অতএব প্রয়োজন হল সেই আদি নামের
যা
কিনা অত্যন্ত গুপ্ত। যা নিরন্তর আমাদের অন্তঃকরণে চলছে। কিন্তু আমরা সেই গুপ্ত
নাম থেকে অনভিজ্ঞ। সেই নামের প্রাপ্তি আমাদের পূর্ণ সদগুরুর দ্বারা হতে পারে।
অমৃত: আমাদের মাথার মাঝে ব্রহ্ম
রন্ধ্র আছে যাকে সহস্রদল পদ্ম (হাজার
পাপড়িযুক্ত পদ্ম) বলা হয়। ধর্মীয় স্থানের জলাশয় বা অমৃত
পান, এর প্রতীক।
গগন মণ্ডল অমৃত কা কুয়া তহাঁ বহ্ম কা বাসা।
সগুরা হোবে ভর ভর পীবে নিগুরা মরত প্যাসা।
কবীর
বলেছেন গগনে অমৃতের কুয়ো রয়েছে, যেখানে সেই পরমাত্মা স্বয়ং বিরাজমান রয়েছেন। এখন
যদি আমরা আকাশে খোঁজ করা শুরু করি তাহলে সারাজীবনেও খুঁজে পাবো না। কারণ এখানে
সাংসারিক কুয়োর কথা বলা হয় নি বরং সেই কুয়োর কথা বলা হয়েছে যা কিনা আমাদের শরীরের
ভিতরেই রয়েছে। যে মনুষ্য গুরুর নিকটে সেই জ্ঞানের যুক্তি নেয়, সেই কেবল জানে
কীভাবে আমরা এই শরীরেই অমৃতের প্রাপ্তি করতে পারি। কবীর জী কেবল এতটুকুই বলেন নি
যে সেখানে কেবল অমৃতের কুয়ো রয়েছে বরং এটাও বলেছেন যে সেখানে ব্রহ্মের বাস অর্থাৎ
প্রভুর দর্শনেরও প্রাপ্তি হবে। কিন্তু আজ সংসারে মনুষ্য একথা ভুলে গেছে যে অমৃতের
প্রাপ্তি প্রভুর দর্শন ছাড়া সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের প্রভুর দর্শন না
হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অমৃতের প্রাপ্তি হতে পারে না।
ব্রহ্মজ্ঞান হল পূর্ণ গুরুর কৃপায় একজন জিজ্ঞাসুর অন্তঃকরণে ঈশ্বর দর্শনের সনাতন পক্রিয়া।
More Related Topics You may Like to Read
কর্মের সার্থকতা?
ধর্মের লক্ষণ?
বাস্তবিক সুখ?
ধর্ম কি?

No comments:
Post a Comment